মহাসংকটে হাওরাঞ্চল
অপরিকল্পিত বাঁধে বিপদ, উন্নয়নের নামে আত্মঘাতী পথচলা
- আপলোড সময় : ০৪-০৫-২০২৬ ০২:০৮:২৪ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৪-০৫-২০২৬ ০২:০৮:২৪ অপরাহ্ন
হাওর বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ- কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনজীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হাওর অঞ্চলই যেন হয়ে উঠছে এক নতুন সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। একসময় যেখানে ফসলহানির প্রধান কারণ ছিল বাঁধ ভেঙে যাওয়া, সেখানে এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে- বাঁধ থাকলেও ফসল রক্ষা পাচ্ছে না; বরং সেই বাঁধই হয়ে উঠছে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।
গত তিন বছরে দুই হাজার ১৩৬টি ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ঘনমিটার মাটি। উন্নয়নের এই পরিসংখ্যান প্রথম দেখায় আশাব্যঞ্জক মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। হাওরের প্রকৃতি ও পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বিবেচনা না করে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে ভারী বৃষ্টিপাত বা উজানের ঢল নামলেই হাওর হয়ে উঠছে জলাবদ্ধতার ফাঁদ।
এবারের মৌসুমে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত বাঁধের প্রভাব। কৃষকরা শত শত পা¤প বসিয়েও পানি সরাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলাফল- হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। অথচ এই বাঁধগুলোই তৈরি হয়েছিল কৃষকের ফসল রক্ষার জন্য।
সমস্যার শেকড় আরও গভীরে। বাঁধ নির্মাণের জন্য হাওরের জাঙ্গাল বা উঁচু জমি কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে। বর্ষায় সেই মাটি ধুয়ে গিয়ে খাল, নদী ও জলাশয় ভরাট করছে। এতে একদিকে যেমন পানি ধারণক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি সমাধানের জন্য নেওয়া উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বিপর্যয়ের জন্ম দিচ্ছে।
এখানে নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতিও বড় কারণ। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে অভিযোগ রয়েছে- রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কারণে অনেক অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় যেমন হচ্ছে, তেমনি প্রকৃত প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
প্রকৃতপক্ষে হাওর একটি সংবেদনশীল জলপ্রবাহভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র। এখানে যেকোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা। শুধুমাত্র বাঁধ নির্মাণ দিয়ে হাওর রক্ষা সম্ভব নয়; বরং খাল-নদী পুনঃখনন, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা - এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন- প্রথমত, হাওরের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করে প্রয়োজনীয় ও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত প্রকল্পগুলোই বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, খাল-নদী ও জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনতে হবে। চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা যায়। পঞ্চমত, হাওর এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ করতে হবে।
হাওর কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই হাওরের সঙ্গে সংঘর্ষ নয়, সহাবস্থানই হওয়া উচিত উন্নয়নের মূল দর্শন। অন্যথায়, উন্নয়নের নামে এই আত্মঘাতী পথচলা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে - যার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
